Friday, April 14, 2017

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল কি না? বিস্তারিতভাবে দলীলসহকার জানিয়ে বাধিত করবেন।

 

 

 

 

 

 

জাওয়াব:

যিনি খলিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার শ্রেষ্ঠতম রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বেমেছাল খুছূছিয়াত ও ফযীলত মুবারক হাদিয়া করেছেন তন্মধ্যে একখানা বিশেষ খুছূছিয়াত ও ফযীলত মুবারক হচ্ছে উনার নূরানী জিসিম মুবারক উনার মুবারক ছায়া ছিল না। সুবহানাল্লাহ!

কাজেই, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার বিষয়টিকে যারা অস্বীকার করলো তারা মূলত নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খুছূছিয়াত বা শান মুবারক অস্বীকার করলো, যা কাট্টা কুফরী এবং পথভ্রষ্ট ও জাহান্নামী হওয়ার কারণ।
প্রকাশ থাকে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা। এ মতটিই বিশুদ্ধ। আর যারা বলে, ছায়া ছিল তাদের তাহক্বীক্বের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাদের বক্তব্য মোটেও শুদ্ধ নয়। মূলত ছায়া ছিল না সম্পর্কিত যে হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে তা যদি মওজু অর্থাৎ অগ্রহণযোগ্য হতো তাহলে বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম হাকিম তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাফিয ইবনে জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম যুরকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের মত বিশ্ব বিখ্যাত সর্বজন মান্য মুহাদ্দিছগণ উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা উনাদের স্বলিখিত কিতাবে বর্ণনা করে তার বরাত দিয়ে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা বলে উল্লেখ করতেন না। তাছাড়া ‘ইকতেবাছ’ কিতাবের লেখক আল্লামা ইমাম ইবনুল হাজ রহমতুল্লাহি বলেন (ছায়ার ন্যায়) এ ধরনের মাসয়ালা সমূহের ক্ষেত্রে অনুরূপ সনদ বিশিষ্ট পবিত্র হাদীছ শরীফই যথেষ্ট। কেননা ইহা হারাম, হালালের মাসয়ালা নয়।
এছাড়া বিশিষ্ট সূফী, ফক্বীহ, বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিছও বুযুর্গ, যিনি প্রতিদিন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যিয়ারতে ধন্য হতেন, তিনি হচ্ছেন শায়খুল মুহাক্কিক হযরত আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি তিনি উনার মাদারিজুন নুবুওওয়াত কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা।
অনুরূপভাবে বিশ্বখ্যাত মুফাসসিরে আ’যম ও মুদাক্কিক্ব, বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ, ফক্বীহ, বুযুর্গ ও সূফী হযরত শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি তিনি উনার তাফসীরে আযীযীতে উল্লেখ করেন যে, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা।
আরো উল্লেখযোগ্য যে, যিনি আফদ্বালুল আউলিয়া, ক্বইয়ূমে আউওয়াল, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি, উনার সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে- জামউল জাওয়াম ও জামিউদ্ দুরার কিতাবে। তিনি উনার বিশ্ববিখ্যাত ও সমাদৃত মাকতুবাত শরীফ, যার সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন যে, আমি যখন এই সমস্ত মাকতুব লিপিবদ্ধ করি তখন আমি নিজেই দেখেছি, মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে হযরত ফেরেশ্তা আলাইহিমুস সালাম আমার ঘর পাহাড়া দিচ্ছেন, তার কারণ হচ্ছে যাতে আমার মাকতুবে শয়তান কোন প্রকার ওয়াস্ওয়াসা দিতে না পারে। তিনি আরো উল্লেখ করেন- আমার পরবর্তীতে যখন হযরত ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম যমীনে আগমন করবেন, তখন উনার কাছে আমার এ মাকতুবাত পেশ করা হবে। তিনি মাকতুবাতে লিখিত বিষয়সমূহকে সত্য বলে প্রতিপাদন করবেন। সুবহানাল্লাহ!
স্মরণীয় যে, এই মাকতুবাত শরীফেই আফদ্বালুল আউলিয়া, ক্বইয়ূমে আউওয়াল, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি তিনি বলেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা।
উল্লেখ্য, এ সকল জবরদস্ত ও অনুসরণীয় বুযুর্গ ব্যক্তিগণ উনাদের দলীলের পর সমঝদার ঈমানদারের জন্য আর কোন দলীলের প্রয়োজন পড়েনা। তা সত্ত্বেও এ বিষয়ে অসংখ্য দলীল থেকে কিছু দলীল ঈমানদারদের ঈমান মজবুতীর জন্য উল্লেখ করা হলো-
হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি জামিউল ওসায়িল ফি শরহে শামায়িল কিতাবের ২১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে-
وفى حديث حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه قال لـم يكن لرسول الله صلى الله عليه وسلم ظل ولم يقم مع الشمس قط الا غلب ضوءه ضوء الشمس ولم يقم مع سراج قط الا غلب ضوءه ضوء السراج.
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোন ছায়া ছিল না। এবং সূর্যের আলোতে কখনও উনার ছায়া পড়তোনা। আরো বর্ণিত আছে, উনার আলো সূর্যের আলোকে অতিক্রম করে যেত। আর বাতির আলোতেও কখনো উনার ছায়া পড়তোনা। কেননা উনার আলো বাতির আলোকে ছাড়িয়ে যেতো।”
আল্লামা শায়েখ ইবরাহীম বেজরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া আলা শামায়িলে মুহম্মদিয়ার ১০৫ পৃষ্ঠায় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূরের দেহ মুবারক সূর্যের আলোর চেয়েও অধিক মর্যাদা সম্পন্ন তা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
وفى حديث حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه لـم يكن لرسول الله صلى الله عليه وسلم ظل ولم يقع مع الشمس قط الا غلب ضوءه ضوءها ولم يقع مع سراج قط الا غلب ضوءه ضوءه.
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া মুবারক ছিলনা এবং সূর্যের আলোতেও কখনই উনার ছায়া পড়তো না। কেননা উনার নূর মুবারক উনার আলো সূর্যের আলোকেও অতিক্রম করে যেতো। আর বাতির আলোতেও কখনই উনার ছায়া পড়তো না। কেননা উনার আলো বাতির আলোর উপর প্রাধান্য লাভ করতো।”
হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খাছায়িছুল কুবরা নামক কিতাবে বর্ণনা করেছেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোন ছায়া ছিলনা। যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
اخرج الحكيم الترمذى عن ذكوان فى نوادر الاصول ان رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يكن يرى له ظل فى شمس ولا قمر.
অর্থ: হাকীম তিরমিযী ফি নাওয়াদিরিল উছূল কিতাবে জাকওয়ান থেকে বর্ননা করেন, “নিশ্চয়ই সূর্য ও চাঁদের আলোতেও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া দেখা যেতো না।”
হযরত আল্লামা ইবনে সাবাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি শিফাউছ ছুদূরে বলেন, “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বৈশিষ্ট্যসমূহ থেকে ইহাও একটি বৈশিষ্ট্য যে, উনার ছায়া ছিলনা।” যেমন তিনি বলেন-
ان ظله كان لا يقع على الارض لانه كان نورا فكان اذا مشى فى الشمس اوالقمر لا ينظر له ظل.
অর্থ: “নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার ছায়া যমীনে পড়তো না কেননা তিনি ছিলেন নূর। অতঃপর যখন তিনি সূর্য অথবা চাঁদের আলোতে হাঁটতেন তখন উনার ছায়া দৃষ্টিগোচর হতোনা।
আল্লামা সুলায়মান জামাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফতুহাতে আহমাদিয়া শরহে হামজিয়া কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে-
لم يكن له صلى الله تعالى عليه وسلم ظل يظهر فى شمس ولا قمر.
অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা। এমনকি চাঁদ ও সূর্যের আলোতেও উনার ছায়া প্রকাশ পেতো না।
হযরত আল্লামা হুসাইন ইবনে মুহম্মদ দিয়ারে বিকরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খামীছ ফি আহওয়ালে আনফুসে নাফীস নামক কিতাবে বর্ণনা করেন-
لم يقع ظله صلى الله تعالى عليه وسلم على الارض ولايرى له ظل فى شمس ولا قمر.
অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া যমীনে পড়তো না এবং চাঁদ ও সূর্যের আলোতেও উনার ছায়া দেখা যেতো না।”
হযরত আল্লামা সাইয়্যিদ যুরকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার শরহে মাওয়াহিবুল লাদুন্নীয়া শরীফে বর্ণনা করেছেন-
لم يكن له صلى الله عليه وسلم ظل فى شمس ولاقمر لانه كان نورا-
অর্থ: “চাঁদ ও সূর্যের আলোতেও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না। কেননা তিনি নূর ছিলেন।” (আর নূরের কোন ছায়া নেই)
হাফিয আল্লামা ইবনে জাওযী মুহাদ্দিছ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবুল ওয়াফায় বর্ণনা করেন-
عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه لم يكن للنبى صلى الله عليه وسلم ظل ولم يقع مع الشمس قط الا غلب ضوءه ضوء الشمس ولم يقع مع سراج قط الا غلب ضوءه ضوء السراج.
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা। আর তিনি সূর্যের আলোতে দাঁড়ালে কখনো ছায়া পড়তো না। কেননা উনার নূর মুবারক উনার উজ্জ্বলতা সূর্যের রশ্মিকে অতিক্রম করে যেতো। কোন জলন্ত বাতির সামনে বসলেও কখনো ছায়া পড়তো না কারণ উনার উজ্জ্বল নূর মুবারক, বাতির আলোকেও ছাড়িয়ে যেতো।”
খাছায়িছুল হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দ্বিতীয় বাবের চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে-
لم يقع ظله على الارض ولارءى له ظله فى شمس ولا قمر قال ابن سبع لانه كان نورا.
অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া মাটিতে পড়েনি। চাঁদ ও সূর্যের আলোতেও উনার ছায়া দেখা যেতোনা। এ সম্পর্কে হযরত ইবনু সাবা’ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, কেননা তিনি নূর ছিলেন।
ইমাম আল্লামা কাজী আয়ায রহমতুল্লাহি উনার শিফা শরীফ কিতাবে বলেছেন-
وما ذكر من انه لا ظل تشخصه فى شمس ولاقمر لانه كان نورا.
অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক উনার দেহ মুবারকের ছায়া সূর্য ও চাঁদের আলোতেও পড়তো না। কেননা তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নূর মুবারক।”
হযরত ফাজেল মুহম্মদ বিন ছিবান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ইস্আফুর রাগিবীন কিতাবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করে বলেন-
وانه لا فيئ له.
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খাছ বৈশিষ্ট্য এই যে, উনার ছায়া ছিল না।
আল্লামা আহমদ বিন মুহম্মদ খতীব কোস্তালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাওয়াহিবুল লাদুন্নীয়া এবং মিনহাজে মুহম্মদীয়া কিতাবে উল্লেখ করেন যে-
رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم کی لیئے سایہ نہ تھا دھوپ میں نہ چاندنی میں-
অর্থ: চাঁদ ও সূর্যের আলোতেও সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিল না।
হযরত শায়েখ মুহম্মদ তাহের রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাজমাউল বিহারে উল্লেখ করেন-
من اسمائه صلى الله تعالى عليه وسلم النور قيل من خصائصه صلى الله تعالى عليه وسلم انه اذا مشى فى الشمس والقمر لا يظهر له ظل.
অর্থ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারকসমূহ থেকে একটি মুবারক নাম হলো নূর। বলা হয়, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বৈশিষ্ট্যসমূহ থেকে একটি বৈশিষ্ট্য হলো যে, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন সূর্য এবং চাঁদের আলোতে হাটঁতেন তখন উনার কোন ছায়া প্রকাশ পেতোনা।
হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাকতুবাত শরীফের তৃতীয় খ-ে উল্লেখ করেছেন-
اورا صلى الله تعالى عليه وسلم سايه نبود در عالم شهادت سايه هر شخص ازشخص لطيف تراست ..ون لطيف تري ازوى صلى الله تعالى عليه وسلم در عالم نباشد او را سايه .. صورت وارد.
অর্থ: “নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা। প্রত্যেক লোকেরই ছায়া উনার দেহের থেকে সূক্ষ্ম। যখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অপেক্ষা আর কিছুই সূক্ষ্ম নয় তখন উনার ছায়া কি আকার ধারণ করতে পারে?”
শায়েখে মুহাক্কিক আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাদারিজুন নুবুওয়াতে বলেছেন-
ونبود مر أنحضرت را صلى الله تعالى عليه وسلم سايه نه در افتاب ونه در قمر.
অর্থ: “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া চাঁদ ও সূর্যের আলোতেও দেখা যেতোনা।”
শাহ আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তাফসীরে আযীযীতে উল্লেখ করেন-
سایہ ایشاں بر زمین نمی افتاد.
অর্থ: “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া মাটিতে পড়তোনা।”
হযরত ইমাম নাসাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তাফসীরে মাদারিক শরীফে উল্লেখ করেছেন-
قال حضرت عثمان ذو النورين عليه السلام ان الله ما اوقع ظلك على الارض لئلا يضع انسان قدمه على ذالك الظل.
অর্থ: আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত উছমান যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম তিনি আখিরী রাসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক আপনার ছায়া মাটিতে পড়তে দেননি। যাতে মানুষ আপনার ঐ ছায়া উনার মধ্যে পা রাখতে না পারে।
সীরাতে শামীতে উল্লেখ করা হয়েছে-
الامام الحكيم قال معناه لئلا يطأ عليه كافر فيكون مذلة له.
অর্থ: ইমাম হাকিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া না থাকার হিকমত এই যে, যাতে কোন বিধর্মী কাফিরেরা উনার ছায়ার উপর পা রাখতে না পারে। কেননা উনার ছায়া মাটিতে পড়লে বিধর্মীরা উনার ছায়া উনার মধ্যে পা রেখে উনার ছায়াকে অপমানিত করতো।
এ সম্পর্কে সীরাতে হালবিয়ায় একটি ঘটনা উল্লেখ আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, এক ইহুদী উনার ছায়া মাড়িয়ে যাচ্ছিল। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে ইহুদী জবাব দিল, সে উনাকে কোন দিক থেকেই কাবু করতে পারিনি। সেজন্য উনার ছায়া সে পদদলিত করছে। নাউযুবিল্লাহ!
হযরত ইমাম ইবনে হাজার মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আফদ্বালুল ক্বোরায় উল্লেখ করেন-
انه صلى الله تعالى عليه وسلم صار نورا انه كان اذا مشى فى الشمس والقمر لا يظهر له ظل.
অর্থ: “নিশ্চয়ই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নূর ছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি যখন চাঁদ ও সূর্যের আলোতে হাঁটতেন তখন উনার ছায়া প্রকাশ পেতো না।”
ফক্বীহে মিল্লাত হযরত আল্লামা মুফতী জালালুদ্দীন আহমদ আমজাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ফতওয়ায়ে ফয়জুর রসূল কিতাবের প্রথম খণ্ডের ২৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-
بیشک حضور پرنور سر کار اقدس صلی اللہ علیہ وسلم کی جسم اقدس کا سایہ نھیں پڑتا تھا جیسا کہ حدیث شریف میں ھی لم یکن لہ ظل لا فی الشمس ولا فی القمر یعنی سورج اور چاندکی روشنی میں حضور کا سایہ نھیں پڑتا تھا-
অর্থ: “নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পূর নূর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র জিসিম মুবারকের ছায়া (যমীনে) পড়তো না।
যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত আছে যে, চাঁদ ও সূর্যের আলোতেও সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া পড়তো না।”
অনুরূপভাবে ফতহুল আযীয, আনওয়ারে মুহম্মদিয়া, মিনহাজে মুহম্মদিয়া, মুতালিউল মুসাররাত, রেসালায়ে হুদালহয়রান ফি নাফয়িল ফাইয়ি আন সাইয়্যিদিল আকওয়ান, রেসালায়ে কাউনারুত তামাম ফি নাফয়ি জিল্লে আন সাইয়্যিদিল আনাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, রেসালায়ে নাফয়িল ফাই, সীরাতে হালবিয়া, আল ইকতেবাছ ইত্যাদি কিতাবসমূহেও উল্লেখ রয়েছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা।
এছাড়াও আরো অসংখ্য দলীল রয়েছে যাতে উল্লেখ আছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছায়া মুবারক ছিল না।
অতএব, উল্লেখিত দলীলসমৃদ্ধ বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে এ আক্বীদা পোষন করতে হবে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম উনার ছায়া ছিলনা। এ আক্বীদাই পোষন করা সকলের জন্য ফরয। এর খিলাফ বা বিপরীত আক্বীদা পোষন করা কুফরী।

সুওয়াল: কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়াকে কেউ কেউ ফরয বলেন, কেউ কেউ সুন্নত বলেন, আবার অনেককে মুস্তাহাব বলতেও শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে কোনটি সঠিক? দলীল সহকারে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: 


 সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার ফতওয়া হলো, কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার কাছে বাইয়াত হওয়া ফরয। এটাই হচ্ছে দলীলসম্মত এবং হাক্বীক্বী ফতওয়া। কেননা ইখলাছ অর্জন করা হচ্ছে ফরয। আর ইখলাছ হাছিল হয়ে থাকে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ছোহবত মুবারক উনার নূর এবং উনার দেয়া সবক্ব ক্বলবী যিকির করার দ্বারা। আর এসকল প্রতিটি বিষয়ই ফরয উনার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয। উনার ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার করা ফরয। উনার থেকে ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ হাছিল করা ফরয। ক্বলবী যিকির-আযকার করা ফরয। উক্ত ফরযসমূহ প্রত্যেকটি কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সাথে সম্পর্কযুক্ত।
স্মরণীয় যে, মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে ইবাদত বা আমল করার নাম ইখলাছ। অর্থাৎ প্রত্যেক পুরুষ ও মহিলাকে ইখলাছ অর্জন করতে হবে। অন্যথায় আমল করে ফায়দা বা মর্যাদা হাছিল করা তো দূরের কথা নাজাত লাভ করাটাই কঠিন হবে।
কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
الناس كلهم هلكى الا الـمؤمنون والـمؤمنون كلهم هلكى الا العالـمون والعالـمون كلهم هلكى الا العاملون والعاملون كلهم هلكى الا الـمخلصون
অর্থ : সমস্ত মানুষ ধ্বংস মু’মিনগণ ব্যতীত এবং মু’মিনগণও ধ্বংস আলিমগণ ব্যতীত এবং আলিমগণও ধ্বংস আমলকারীগণ ব্যতীত এবং আমলকারীগণও ধ্বংস ইখলাছ অর্জনকারীগণ ব্যতীত। (মিরকাত শরীফ)
যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
وما امروا الا ليعبدوا الله مخلصين له الدين
অর্থ: ঈমানদারদেরকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেনো খালিছভাবে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার জন্যে ইবাদত বন্দিগী করে। (সূরা বাইয়্যিনাহ শরীফ: আয়াত শরীফ ৫)
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عن حضرت ابى امامة الباهلى رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان الله لا يقبل من العمل الا ما كان له خالصا وابتغى به وجهه
অর্থ: “হযরত আবূ উমামা আল বাহিলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক ওই আমল কবুল করবেন না, যা ইখলাছের সাথে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি মুবারক অর্জনের জন্য করা না হয়।” (নাসায়ী শরীফ, দায়লামী শরীফ)
উল্লেখ্য, মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে কোন আমল করা হলে তা হবে গইরুল্লাহ। তা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কখনোই কবুলযোগ্য হবে না। তা যত বড় আমলই হোক না কেন। যার উদাহরণ মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ সূরা মাঊন উনার মধ্যে উল্লেখ করেছেন।
ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
فويل للمصلين
অর্থাৎ, নামায আদায়কারীদের জন্য আফসুস তথা জাহান্নাম। (পবিত্র সূরা মাঊন শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৪)
অনুরূপভাবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন, যা মুসলিম শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্য না থাকার কারণে জিহাদকারী জিহাদ করা সত্বেও, ক্বারী কুরআন শরীফ শিক্ষা দেয়া সত্বেও এবং আলিম ইলম উনার প্রচার প্রসার করা সত্বেও এবং দানশীল দানের সমস্ত রাস্তায় দান করা সত্বেও তাদের সকলকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। নাউযুবিল্লাহ!
কাজেই, আমল করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ ইখলাছের সাথে আমল করতে হবে। তবেই সে আমলের দ্বারা-পরিপূর্ণ ফায়দা বা মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اخلص دينك يكفيك العمل القليل
অর্থ: ইখলাছের সাথে আমল করো। অল্প আমলই তোমার নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। (আল মুসতাদরাক লিল হাকিম)
অতএব, প্রত্যেকের জন্য ইখলাছ অর্জন করা ফরয। আর ইলমুল ইখলাছ উনার অপর নামই হচ্ছে ইলমুল ক্বলব বা ইলমুত তাছাওউফ।
যেমন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عن حضرت الحسن رحمة الله عليه قال العلم علمان فعلم فى القلب فذاك العلم النافع وعلم على اللسان فذالك حجة الله عز وجل على ابن ادم
অর্থ: “হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, ইলম দু’প্রকার। একটি হচ্ছে ক্বলবী ইলম (ইলমে তাছাওউফ) যা উপকারী ইলম। অপরটি হচ্ছে যবানী ইলম (ইলমে ফিক্বাহ) যা মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে বান্দার প্রতি দলীল স্বরূপ।” (দারিমী, মিশকাত, মিরকাত, মাছাবীহুস সুন্নাহ)
ইমামে আ’যম হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “ইলম শিক্ষা করা ফরয বলতে বুঝায় ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ। অর্থাৎ উভয়টিই শিক্ষা করা ফরয।”
উল্লেখ্য, হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি প্রথমে আওলাদে রসূল হযরত ইমাম বাকির আলাইহিস সালাম উনার কাছে মুরীদ হন এবং উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করার পর উনারই ছেলে আওলাদে রসূল হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক্ব আলাইহিস সালাম উনার কাছে বাইয়াত হয়ে কামালিয়াত অর্জন করেন। সুবহানাল্লাহ! যা বিশ্বখ্যাত গায়াতুল আওতার ফী শরহে দুররিল মুখতার, সাইফুল মুকাল্লিদীন, ইছনা আশারিয়া ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।
হযরত মোল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব মিশকাত শরীফ উনার শরাহ মিরকাত শরীফ-এ হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি মালিকী মাযহাবের ইমাম উনার ক্বওল উল্লেখ করেছেন যে-
من تفقه ولـم يتصوف فقد تفسق ومن تصوف ولـم يتفقه فقد تزندق ومن جمع بينهما فقد تحقق
অর্থ: “যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো অথচ ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করলো না, সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাওউফ শিক্ষা করলো কিন্তু ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো না অর্থাৎ গুরুত্ব দিলনা, সে যিন্দিক (কাফির)। আর যে ব্যক্তি উভয়টিই অর্জন করলো, সে ব্যক্তিই মুহাক্কিক।”
জানা আবশ্যক যে, ইলমে ফিক্বাহ অর্থাৎ ওযূ, গোসল, ইস্তিঞ্জা, নামায-কালাম, মুয়ামালাত, মুয়াশারাত ইত্যাদি শিক্ষার জন্য ওস্তাদ গ্রহণ করা যেমন ফরয; সেটা মাদরাসায় গিয়েই হোক অথবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো ওস্তাদের নিকট থেকেই হোক তা শিক্ষা করা ফরয। তদ্রূপ ইলমে তাছাওউফ উনার জন্যও ওস্তাদ গ্রহণ করা ফরয। আর এ ওস্তাদকেই আরবীতে ‘শায়েখ’ বা ‘মুর্শিদ’ বলা হয় আর ফারসীতে ‘পীর’ বলা হয়।
বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে যে-
كل ما يترتب عليه الاثر من الفروض الاعيان فهو فرض عين
অর্থ : “যে কাজ বা আমল ব্যতীত ফরযসমূহ আদায় করা সম্ভব হয়না, ফরযগুলোকে আদায় করার জন্য সে কাজ বা আমল করাও ফরয।”
হানাফী মাযহাব উনার মশহূর ফিক্বাহর কিতাব ‘দুররুল মুখতার’ উনার মাঝে উল্লেখ আছে যে-
ما لايتم به الفرض فهو فرض
অর্থ : “যে আমল ব্যতীত কোনো ফরয পূর্ণ হয়না, উক্ত ফরয পূর্ণ করার জন্য ওই আমল করাও ফরয।”
উল্লিখিত উছুলের ভিত্তিতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইলমে তাছাওউফ যেহেতু অর্জন করা ফরয আর তা যেহেতু কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব নয়, সেহেতু একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করাও ফরয।
শুধু তাই নয়, কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ছোহবত ইখতিয়ার করা বা উনাকে অনুসরণ করার নির্দেশ পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যেই রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
يايها الذين امنوا اتقوا الله وكونوا مع الصدقين.
অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! তোমরা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো এবং ছাদিক্বীন বা সত্যবাদীগণ উনাদের সঙ্গী হও।” (পবিত্র সূরা তওবা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১১৯)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে ছাদিক্বীন দ্বারা উনাদেরকেই বুঝানো হয়েছে, যাঁরা যাহির-বাতিন, ভিতর-বাহির, আমল-আখলাক্ব, সীরত-ছূরত, ক্বওল-ফে’ল সর্বাবস্থায় সত্যের উপর ক্বায়িম রয়েছেন। অর্থাৎ যাঁরা ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ উভয় ইলমে তাকমীলে (পূর্ণতায়) পৌঁছেছেন।
মোট কথা, যিনি বা যাঁরা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মত মুবারক অনুযায়ী মত হয়েছেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পথ মুবারক অনুযায়ী পথ হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
واتبع سبيل من اناب الى
অর্থ : “যিনি আমার দিকে রুজু হয়েছেন, উনার পথকে অনুসরণ করো।” (পবিত্র সূরা লুক্বমান শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫)
অন্যত্র খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
من يهد الله فهو الـمهتد ومن يضلل فلن تـجد له وليا مرشدا
অর্থ : “খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি যাঁকে হিদায়েত দান করেন, সেই হিদায়েত পায়। আর যে ব্যক্তি গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ় থাকে, তার জন্য কোনো ওলীয়ে মুর্শিদ (কামিল শায়েখ) পাবেন না।” (পবিত্র সূরা কাহফ্ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৭)
অর্থাৎ যারা কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হয়না, তারা পথভ্রষ্ট। কারণ তখন তাদের পথ প্রদর্শক হয় শয়তান। নাঊযুুবিল্লাহ!
যার কারণে সুলত্বানুল আরিফীন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি, সাইয়্যিদুত ত্বায়িফা হযরত জুনায়িদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারাসহ আরো অনেকেই বলেছেন যে-
من ليس له شيخ فشيخه شيطان
অর্থ : “যার কোনো শায়েখ বা মুর্শিদ নেই, তার মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক হলো শয়তান।” নাঊযুবিল্লাহ! (ক্বওলুল জামীল, নুরুন আলা নূর, তাছাওউফ তত্ত্ব)
আর শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الشيخ فى اهله كالنبى فى امته وفى رواية الشيخ لقومه كالنبى فى امته
অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম উনারা উম্মতের নিকট যেরূপ সম্মানিত ও অনুসরণীয়, শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনিও উনার অধীনস্থদের নিকট তদ্রƒপ সম্মানিত ও অনুসরণীয়।” (দায়লামী শরীফ, মাকতুবাত শরীফ, জামিউল জাওয়ামি’, আল মাক্বাছিদুল হাসানাহ, তানযীহুশ শরীয়াহ, আল মীযান, আল জামিউছ ছগীর, আদ দুরারুল মুনতাশিরাহ ইত্যাদি)
অর্থাৎ হযরত নবী-রসূল আলাইহিস সালাম উনার দ্বারা যেরূপ উম্মতের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সর্বক্ষেত্রে ইছলাহ লাভ হয়, সেরূপ শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার দ্বারা মুরীদের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সর্বক্ষেত্রে ইছলাহ লাভ হয়। সুবহানাল্লাহ!
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
لا يؤمن احدكم حتى يكون الله ورسوله احب اليه من نفسه وماله ووالده وولده والناس اجمعين.
অর্থ: “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কামিল মু’মিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের নিকট মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তোমাদের জান-মাল, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় না হবেন।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ, ফতহুল বারী, উমদাতুল ক্বারী, ইরশাদুস্ সারী, শরহে নববী শরীফ, মিরকাত শরীফ, আশয়াতুল লুময়াত, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, শরহুত ত্বীবী)
এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ আছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফখানা ইরশাদ মুবারক করেন, তখন সেখানে হযরত উমর ইবনুল খ্বত্তাব আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনাকে আমি সবকিছু থেকে অধিক মুহব্বত করি কিন্তু আমার প্রাণের চেয়ে অধিক মুহব্বত এখনো করতে পারিনি। তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “হে হযরত উমর ইবনুল খত্তাব আলাইহিস সালাম! আপনি এখনও মু’মিনে কামিল হতে পারেননি।” একথা শুনে হযরত উমর ইবনুল খ্বত্তাব আলাইহিস সালাম তিনি বাচ্চা শিশুদের ন্যায় কাঁদতে লাগলেন। (কারণ তিনি মনে করেছিলেন, যেজন্য তিনি পিতা-মাতা, ভাই-বোন, বাড়ী-ঘর, ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ইত্যাদি সব ছেড়ে ঈমান গ্রহণ করেছেন, সে ঈমানই যদি পরিপূর্ণ না হয়, তাহলে এতকিছু ত্যাগ করার সার্থকতা কোথায়?
হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার এই আকুতি দেখে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে কাছে ডাকলেন এবং নিজ হাত মুবারক উনার সিনার উপর রাখলেন (তাছাওউফের ভাষায়, ফায়িযে ইত্তিহাদী দিলেন)। সাথে সাথে হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার এখন এরূপ অবস্থা হয়েছে যে, আমি একজন কেন? আমার ন্যায় শত-সহ সহস্র ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম আপনার জন্যে জান কুরবান করতে প্রস্তুত আছি।
একথা শুনে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “হে হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম! এতক্ষণে আপনি মু’মিনে কামিল হয়েছেন। সুব্হানাল্লাহ!
উল্লেখিত ঘটনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা প্রত্যেকেই কামিল বা পরিপূর্ণ মু’মিন হয়েছেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক ছোহবত ও মুবারক ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ উনার কারণেই। অন্য কোন আমলের দ্বারা মু’মিনে কামিল হননি। যদি হতেন তবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাকে বলতেন, আপনি অমুক আমল বেশি বেশি করুন তবেই মু’মিনে কামিল হবেন। কিন্তু তিনি তা না বলে উনাকে ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ্ মুবারক দিয়ে মু’মিনে কামিল বানিয়ে দিলেন। সুবহানাল্লাহ!
এ প্রসঙ্গে মশহূর ওয়াক্বিয়া বর্ণিত রয়েছে যে, মানতিকের ইমাম হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাদরাসায় লেখাপড়া শেষ করেছেন। তিনি কিতাবে পড়েছেন, ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ উভয় প্রকার ইলমই অর্জন করতে হবে। প্রত্যেকের জন্য সেটা ফরয। তিনি তো ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করেছেন মাদরাসায় গিয়ে। কিন্তু তখন পর্যন্ত উনার ইলমে তাছাওউফ অর্জন করা হয়নি। তাই তিনি ইলমে তাছাওউফ অর্জন করার জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী হযরত নজীবুদ্দীন কুবরা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ গেলেন। গিয়ে বললেন, হুযূর! আমি আপনার কাছে বাইয়াত হতে এসেছি। মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরার নাম কি? তিনি বললেন, আমার নাম ফখরুদ্দীন। মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী বললেন, কোন ফখরুদ্দীন, যিনি মানতিকের ইমাম? তিনি জবাব দিলেন, জী হুযূর! আমি সেই ফখরুদ্দীন। মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী হযরত নজীবুদ্দীন কুবরা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বাইয়াত করালেন। অত:পর সবক দিয়ে বললেন, তোমার ভিতর মানতিকের ইলম পরিপূর্ণ। কাজেই, তুমি আগামী এক বছর যাহিরী কোন পড়া-শুনা না করে নিরিবিলি অবস্থান করে ইলমে তাছাওউফ বা তরীক্বতের সবক আদায় করতে থাক। মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নির্দেশ মুতাবিক তিনি নিরিবিলি অবস্থান করে তরীক্বতের সবক আদায় করতে লাগলেন। এরপর তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন মুর্শিদ ক্বিবলা তো পড়তে নিষেধ করেছেন। কিন্তু লিখতে তো নিষেধ করেননি। এ চিন্তা করে তিনি তরীক্বতের সবক আদায়ের ফাঁকে ফাঁকে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার তাফসীর লিখতে শুরু করলেন এবং বেশকিছু অংশ তাফসীর লিখলেন। যা তাফসীরে কবীর হিসেবে আজ সারাবিশ্বে মশহূর। বছর শেষে তিনি যখন উনার মুর্শিদ ক্বিবলা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফ-এ উপস্থিত হলেন। মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে দেখে বললেন, তোমার তো ইলমে মানতিক আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বললেন, তোমার ভিতরে ইলমে তাছাওউফ প্রবেশ করাতে হলে ইলমে মানতি কমাতে হবে এবং এটা বলে তিনি ইলমে মানতিক কমানোর জন্য ফায়িয নিক্ষেপ করলেন। এতে হযরত ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ভিতরে কটকট শব্দ হতে লাগলো। তিনি মুর্শিদ ক্বিবলা উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুযূর! আমার ভিতরে কিসের শব্দ হচ্ছে। মুর্শিদ ক্বিবলা বললেন, তোমার ভিতরে মানতিকের যে অতিরিক্ত ইলম সেটা কমিয়ে দিচ্ছি। তিনি বললেন, হুযূর! বেয়াদবি মাফ করবেন, ফখরুদ্দীনের ফখরই তো ইলমে মানতিক। তা না কমানোর জন্য তিনি আরজু পেশ করলেন এবং মুর্শিদ ক্বিবলা উনা সবক নিয়ে নিজের এলাকায় চলে আসলেন। মুর্শিদ ক্বিবলা উনা ইজাযত নিয়ে তিনি স্বীয় এলাকায় তা’লীম-তালক্বীন, দর্স-তাদরীসের কাজ করতে লাগলেন। তিনি জানেন শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সাধারণ মুসলমান তো বটে, যারা আলিম-উলামা, পীর-মাশায়িখ, ছুফী-দরবেশ দাবীদার তাদেরকেও শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এবং অনেককে বিভ্রান্ত করেও ফেলে। এমনকি ইন্তিকালের মুহূর্তেও শয়তান ধোঁকা দিয়ে ঈমানহারা করার চেষ্টা করে থাকে। সেজন্য মানতিকের ইমাম হযরত ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি মুখতালিফ রিওয়ায়েত একশ থেকে এক হাজার দলীল প্রস্তুত করে রাখলেন যাতে ইন্তিকালের সময় উনাকে শয়তান ধোঁকা দিয়ে ঈমানহারা করতে না পারে। সত্যিই দেখা গেল, হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার যখন ইন্তিকালের সময় উপস্থিত হলো তখন ইবলীস হাযির হয়ে গেল। হাযির হয়ে সে মহান আল্লাহ পাক দুজন বলে যুক্তি পেশ করতে লাগলো। আর ইবলীসের সে বাতিল যুক্তি খ-ন করে হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ থেকে দলীল পেশ করতে লাগলেন। উনার সমস্ত দলীল শেষ হয়ে গেল তথাপি ইবলীসের বাতিল যুক্তি খণ্ডন করা গেলনা। এখন ঈমানহারা হয়ে ইন্তিকাল করার উপক্রম। তিনি এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে উনার মুর্শিদ ক্বিবলা তিনি যুহর নামাযের ওযূ করছিলেন। তিনি ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার এমন ভয়াবহ অবস্থা জানতে পেরে ওযূর পানি নিক্ষেপ করে বললেন, হে ফখরুদ্দীন রাযী! তুমি ইবলীসকে বল, বিনা দলীলে মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন। বহু দূর থেকে যখন মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিক্ষিপ্ত ওযূর পানি এসে উনার চেহারার উপর পড়লো এবং মুর্শিদ ক্বিবলা উনার ক্বওল মুবারকের আওয়াজ উনার কানে এসে পৌঁছাল তিনি ইবলীসকে জানিয়ে দিলেন, হে ইবলীস! তুমি জেনে রাখ, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন। এটা আমি বিনা দলীলেই বিশ্বাস করি। তখন ইবলীস বললো, হে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী! আপনি আজকে আপনার মুর্শিদ ক্বিবলা উনার উসীলায় বেঁচে গেলেন। অন্যথায় আপনাকে ঈমানহারা করে মৃত্যুমুখে পতিত করে চলে যেতাম।
এ ওয়াক্বিয়া দ্বারা হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ফায়িয-তাওয়াজ্জুহ মুবারক উনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
অতএব, হযরত নবী-রসূল আলাইহিস সালাম উনার উম্মত না হয়ে যেরূপ ইছলাহ ও নাজাত লাভ করা যায়না, তদ্রƒপ কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত না হওয়া পর্যন্ত ইছলাহ বা পরিশুদ্ধতা ও নাজাত লাভ করা যায়না। বরং শয়তানী প্রবঞ্চনায় পড়ে গোমরাহীতে নিপতিত হওয়াই স্বাভাবিক।
আর এ কারণেই জগদ্বিখ্যাত আলিম, আলিমকুল শিরোমণি, শ্রেষ্ঠতম মাযহাব, হানাফী মাযহাব উনার প্রতিষ্ঠাতা ও ইমাম, ইমামুল আ’যম হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
لولا سنتان لـهلك ابو نعمان
অর্থ : “(আমার জীবনে) যদি দু’টি বৎসর না পেতাম, তবে আবূ নু’মান (আবূ হানীফা) ধ্বংস হয়ে যেতাম।” (সাইফুল মুকাল্লিদীন, ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া)
অর্থাৎ আমি হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি যদি আমার শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা হযরত ইমাম বাকির আলাইহিস সালাম অতঃপর হযরত ইমাম জা’ফর ছাদিক আলাইহিস সালাম উনাদের নিকট বাইয়াত না হতাম, তবে আমি ধ্বংস বা বিভ্রান্ত হয়ে যেতাম।
সুতরাং প্রমাণিত হলো, যে ব্যক্তি কোনো কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত না হবে, তার পক্ষে শয়তানী প্রবঞ্চনা ও বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা আদৌ সম্ভব নয়। কেননা কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত ক্বলবে যিকির জারি করা অসম্ভব। আর ক্বলবে যিকির জারি করা ব্যতীত শয়তানী ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকাও সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
ومن يعش عن ذكر الرحـمن نقيض له شيطنا فهو له قرين. وانـهم ليصدونـهم عن السبيل ويـحسبون انـهم مهتدون.
অর্থ : “যে ব্যক্তি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র যিকির থেকে বিরত (গাফিল) থাকে, আমি (খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক) তার জন্য একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেই। অর্থাৎ তার গাফলতীর কারণেই তার সাথে একটা শয়তান নিযুক্ত হয়ে যায়। অতঃপর সেই শয়তান তার সঙ্গী হয় এবং তাকে সৎ পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে অর্থাৎ পাপ কাজে লিপ্ত করে দেয়। অথচ তারা মনে করে, তারা সৎ পথেই রয়েছে।” (পবিত্র সূরা যুখরূফ শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৬, ৩৭)
তাই পরিশুদ্ধতা লাভ করার জন্য বা ক্বলবে যিকির জারি করার জন্য অবশ্যই একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হতে হবে।
আর এ কারণেই পৃথিবীতে যত হযরত ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা আগমন করেছেন, উনাদের প্রত্যেকেই কোনো একজন শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হয়েছেন এবং উনারা উনাদের স্ব স্ব কিতাবে শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করাকে ফরয বলেছেন। যেমন- গউছুল আ’যম, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, ইমামুল আইম্মাহ হযরত বড়পীর আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিতাব ‘সিররুল আসরার’ নামক কিতাবে লিখেন-
ولذالك طلب اهل التلقين لـحياة القلوب فرض
অর্থ : “ক্বল্ব্ জিন্দা করার জন্য অর্থাৎ অন্তর পরিশুদ্ধ করার জন্য ‘আহলে তালক্বীন’ তালাশ করা অর্থাৎ কামিল মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা ফরয।” অনুরূপ ‘ফতহুর রব্বানী’ কিতাবেও উল্লেখ আছে।
তদ্রূপ হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিশ্ব সমাদৃত কিতাব ‘ক্বিমিয়ায়ে সায়াদাত’ কিতাবে, ক্বাইউমুয যামান হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘মাকতুবাত শরীফ’ কিতাবে, আওলাদে রসূল, আশিকে নবী হযরত আহমদ কবীর রেফায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার আল ‘বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ’ কিতাবে উল্লেখ করেন যে, “অন্তর পরিশুদ্ধ করার জন্য বা ইলমে তাছাওউফ অর্জন করার জন্য একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয।”
অনুরূপ তাফসীরে রূহুল বয়ান, তাফসীরে রূহুল মায়ানী ও তাফসীরে কবীর ইত্যাদি কিতাবেও উল্লেখ আছে।
মূলত কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা তিনি মুরীদের অন্তর পরিশুদ্ধ করতঃ খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার খাছ নৈকট্য মুবারক লাভ করানোর এক বিশেষ উসীলা বা মাধ্যম।
এ জন্যেই খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাক উনার মধ্যে নির্দেশ মুবারক করেন-
يايها الذين امنوا اتقوا الله وابتغوا اليه الوسيلة
অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! তোমরা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো এবং খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য মুবারক লাভ করার জন্য ওসীলা তালাশ (গ্রহণ) করো।” (পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৫)
উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় “তাফসীরে রূহুল বয়ান” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে-
الوصول لا يـحصل الا بالوسيلة وهى العلماء الـحقيقة ومشائخ الطريقة
অর্থ : “ওসীলা ব্যতীত খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য মুবারক লাভ করা যায়না। আর উক্ত ওসীলা হচ্ছেন হাক্বীক্বী আলিম বা তরীক্বতপন্থী কামিল মুর্শিদ উনারা।”
উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে প্রতিভাত হলো যে, প্রত্যেকের জন্য একজন কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয।

সুওয়াল : পূর্বে বা আদিম যুগে মানুষ গাছের ছাল বা পাতা পরিধান করতো। এখন প্রশ্ন হলো হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার পোশাক কি ছিল? তিনিও কি গাছের পাতা পরিধান করতেন? জানতে বাসনা রাখি।




জাওয়াব:  


আদিম যুগে মানুষ গাছের ছাল পরিধান করতো, কথাটা শুদ্ধ নয়। হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি যখন পৃথিবীতে তাশরীফ আনেন, তখন মহান আল্লাহ পাক ওনাকে বেহেশতী পোশাক দান করেন এবং হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি এই বেহেশতী পোশাক পরিধান করতেন। এর পর হযরত জীবরাঈল আলাইহিস সালাম হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে পোশাক তৈরীর কলা-কৌশল শিখিয়ে দেন এবং তারপর থেকে হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি নিজে পোশাক তৈরী করে পরিধান করতে থাকেন। তবে পূর্বকালে কিছু লোক ছিল, যারা সভ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জঙ্গলে গিয়ে বসবাস করতো এবং নিজস্ব মনগড়া নিয়ম-নীতিতে চলার কারণে গাছের ছাল, লতা-পাতা পরে থাকতো। যেমন আজকালকার যুগেও দেখা যায় কিছু জংলী লোক বনে-জঙ্গলে বাস করে এবং ছাল, লতা-পাতা দিয়ে শরীর আবৃত করে রাখে। তবে একথা কখনই শুদ্ধ নয় যে, পূর্ব যুগে সকল লোকই গাছের ছাল পরিধান করতো। (কাসাসুল আম্বিয়া)